অনেক আগে থেকেই পরিচয় থাকার সুবাদে তাঁর সান্নিধ্য পাবার লোভ আমি কখনোই সংবরন করতে পারিনি! উত্তরার কোনও সংবাদ বিষয়ে, আমি ছিলাম তাঁর নির্ভরযোগ্য সংবাদদাতা। আমার গ্রামের বাড়ি থেকে যখন তাঁর কল পেলাম,’ঢাকা চলে এসো। কখন আসতে পারবা’ আমি যখন ২ দিন সময় চেয়ে নিলাম তখন সে সেই ২টা দিনই যেনো অনেক দীর্ঘ সময় মনে করে আমাকে লিখলো, আমি বুঝতে পেরেছিলাম অত্যন্ত জরুরী কোনও কাজ নিশ্চয়ই! চলে এসেছিলাম একদিন পরেই। বাংলাভূমি নামক পত্রিকাটি নতুন এবং ভিন্ন আঙিকে প্রকাশ করা এবং গাজীপুরের মাওনা সবুজ পাতা রিসোর্টে প্রেস কাউন্সিল এবং বাংলাভূমির যৌথ আয়োজনে প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের দিনক্ষণ ঠিক করলেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পিআইবির চেয়ারম্যান জনাব ফারুক ওয়াসিফ সময় দিতে পারলেও প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বিচারপতি জনাব এ কে এম আব্দুল হাকিম ২৮ জুন উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে, প্রশিক্ষনের সে আয়োজনটি অসম্পন্ন থেকে যায়। তবুও রিমন ভাই আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রশিক্ষণটি সম্পন্ন করার। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তাঁর বাসায় একান্ত আলাপচারিতায় আস্থাভাজন ছোটভাই জ্ঞানকরে আমার সাথে তিনি ভাগাভাগি করে নিলেন সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাঁর ইচ্ছে ছিলো গাজীপুরে তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন সাংবাদিকদের জন্য যেখানে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন পিআইবি, গনমাধ্যম ইন্সটিটিউট, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের ১ম বর্ষের সিলেবাস। প্রশিক্ষকও তিনি হায়ার করতে চেয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই। যত টাকা খরচ হোক, তিনি তা করতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকদের কথা ভেবেই। রাজধানীর ফুটপাত দখল নিয়ে বাংলাভুমিতে আমার প্রথম লেখা সম্পাদনা করে প্রকাশ করলেন তিনি। তারপর কিডনি দাতা টুনির সাভারের কলমার বাসায় পাঠালেন, সাথে পাঠালেন এটিএন নিউজের সাভার প্রতিনিধি কামরুল ভাই এবং বাংলাভূমি পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মানু সিদ্দিকী ভাইকে। সাভার থেকে ফিরে আসার পথে যখন তাঁকে কল করে জানালাম, রাতে তাঁর সাথে বসুন্ধরা দেখা করবো, স্নেহপূর্ণ দরদ দিয়ে তখন সে বললো, না রে ভাই, সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছিস, বাসায় চলে যা। কাল বসবো একসাথে। পরেরদিন নর্দ্দা গেলে টুনি তারেকের নিউজ শেষ করতে করতে রাত দেড়টা বেজে গেলো। একসাথে আমি, বাংলাভূমির নিউজ ডেস্ক প্রধান তুহিন ভূঁইয়া আর ভাই রাতের খাবার খেয়ে, বাংলাভুমি নিয়ে কত যে স্বপ্নের কথাই না সেদিন হলো! আমাকে উদ্দেশ্য করে যখন ভাই বললো, “যদি মরে যাই বলতে পারবি তোর ভাই কি করতে চেয়েছিলো।” তখন ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি আমার পিতৃতুল্য ভাইটি আর আমাকে উপদেশ দেবেনা, সাহস যোগাবেনা! গত তিনদিন আগে যখন আমি আর তুহিন ভূঁইয়া তাঁর বাসায় যাই, রাত ৮ টার দিকে এসে আমাকে বলে, কিরে কিছু খাবিনা নাকি ক্ষুধা-টুধা লাগেনি! তখন পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে খাবার আনতে পাঠানোর সময় যখন আমরা দুজন বলি, ভাই আসার সময় আমি আর তুহিন ভাই বাইক থামিয়ে বাড্ডা থেকে খেয়ে এসেছি। তখন রিমন ভাই মুচকি হেসে বলেন, দেখছো দুষ্টুগুলা তবুও না বলে না! রাতে খিঁচুড়ি আর মাংস রান্নার খবর দিতে গিয়ে বড়ভাইসুলভ আদর করে বললো, খিঁচুড়ি রান্না হচ্ছে, খেয়ে যাবি। মনে পড়তেই চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে! আগের দিন পরিকল্পনা ছিলো শালবনের বিষয়ে এবং পত্রিকা সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য আমাদের বিশেষ টিম গঠনে আমি এবং তুহিন ভূঁইয়া ট্রেণে কমলাপুর থেকে এবং ভাই বিমানবন্দর স্টেশন থেকে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে দুপুরে সেখানে গিয়ে লাঞ্চ করবো। পরেরদিন অর্থাৎ গত মঙ্গলবার পরিকল্পনামাফিক সকাল ৯টায় ভাইকে কল দিতেই সে জানালো, তোকে কষ্ট করে গাজীপুর আসতে হবেনা। তুই ঢাকাতেই থাক, প্রধান বনরক্ষক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিতে যেতে হবে তোকে। তাঁর নির্দেশনামতো থেকে যাই আমি। হোয়াটসঅ্যাপে একটি ফোনের ছবি পাঠিয়ে ভাই আমাকে লিখেছিলেন, ফোনটি তাঁর দরকার, লাগবেই। আমি ধানমন্ডি গিয়ে ভাইয়ের সে ৯৮০০ অ্যাম্প এর মোবাইলটির জন্য গেলে, ভাই বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেন। সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় গেলে মোবাইলের রিংটোনের বিষয়ে কত যে হাস্যরস করেছি। রিংটোনটি ছিলো ওয়্যারলেস হ্যান্ডসেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথোপকথনের। কিন্তু গতকাল তুহিন ভূঁইয়া যখন আমাকে কল করে জানালো যে ভাই স্ট্রোক করেছে, তাঁকে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো আমার! ঠিক যেই ভয়টিই করছিলাম ভাইকে নিয়ে তাই হলো! একটানা ৬ দিন না ঘুমানো সাঈদুর রহমান রিমনের সাথে যারা ঘনিষ্ঠভাবে মেশেনি, তারা জানবে না কোনওদিনই যে, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতাকে তিনি কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবার স্বপ্নে ঘুমোতে পারতেন না! হাসপাতালে পৌছে স্ট্রেচারে যখন প্রিয় মানুষটিকে শায়িত দেখি, আমি যেনো পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, রিমন ভাই আর নেই! এম্বুলেন্সে করে যখন তাঁর লাশ তাঁর বসুন্ধরার বাসার উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছিলাম, তাঁর মাথার কাছে বসেছিলাম আর আল্লাহকে বলছিলাম, হে আল্লাহ! যদি মিরাকল বলতে কিছু থেকে থাকে, রিমন ভাই যদি একটু নড়ে উঠতো, কিংবা ঘুম ভেঙে জেগে উঠতো!
আমার ভাইটিতো আর জাগলো না! কেউ তো আর এমন ভরসা দেবেনা, ‘ভয় করিস না। আমি তোর ভাই না’
হৃদয়ের যে আসনে সমাসীন আমার ভাই, সেখানে আর কারোও প্রবেশাধিকার নেই!
ওপারে ভালো রেখো আমার শিশুর মতো সরল ভাইটিকে;
মহান আল্লাহর দরবারে চোখের জলের এই মিনতি আমার সারা জীবনের-
রাশেদুল হক 

























