ঢাকা ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি, ঝুঁকিতে মেধা ও বিকাশ

নিম্ন আয়ের পরিবার নয়, বরং দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের শরীরেই নীরব ঘাতক সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন।

জরিপের পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার যেখানে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আর্থসামাজিক অবস্থার মাপকাঠিতে পরিবার যত ওপরের দিকে, তাদের শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতিও তত বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গত ১৪ অক্টোবর চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘মেডআর্কাইভ’-এ এটি প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে প্রাপ্ত ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্ত পরীক্ষার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে গড়ে প্রায় ৩৯ জন শিশুর (৩৮.৫%) রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ ‘নিরাপদ’ বলা যায়।

গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন জানান, ধনী পরিবারের শিশুদের প্যাকেটজাত খাবার বেশি খাওয়ার প্রবণতা থাকে। এছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের ব্যবহার বেশি, যেগুলোতে সিসার উপস্থিতি থাকতে পারে।

বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লার মতে, “এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা বাহারি খেলনা বেশি পায় এবং পোলট্রি মুরগির মাংস বেশি খায় (যাদের খাবারে সিসা থাকতে পারে)। ফলে এসব উৎস থেকে তাদের শরীরে সিসা প্রবেশের সুযোগ বেশি থাকে।”

সিসা শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, “সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করতে পারে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা এবং আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়।” তিনি আরও জানান, অনেক সময় বাহ্যিকভাবে শিশুকে সুস্থ দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।

গবেষণায় বিভাগভেদে সিসার উপস্থিতির বড় পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা সবচেয়ে বেশি (৬৫.২%), এরপর রয়েছে সিলেট (৪৬.৭%) ও চট্টগ্রাম (৪২.১%)। অন্যদিকে, রাজশাহীতে এই হার সবচেয়ে কম (১৫.৯%)।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। সিসার বিষক্রিয়া প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসা নয়, বরং এর মূল উৎসগুলো শনাক্ত করে তা থেকে শিশুদের দূরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: প্রথম আলো।

চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি, ঝুঁকিতে মেধা ও বিকাশ

প্রকাশ : ০৪:৩৮:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

নিম্ন আয়ের পরিবার নয়, বরং দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের শরীরেই নীরব ঘাতক সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন।

জরিপের পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার যেখানে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আর্থসামাজিক অবস্থার মাপকাঠিতে পরিবার যত ওপরের দিকে, তাদের শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতিও তত বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গত ১৪ অক্টোবর চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘মেডআর্কাইভ’-এ এটি প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে প্রাপ্ত ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্ত পরীক্ষার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে গড়ে প্রায় ৩৯ জন শিশুর (৩৮.৫%) রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ ‘নিরাপদ’ বলা যায়।

গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন জানান, ধনী পরিবারের শিশুদের প্যাকেটজাত খাবার বেশি খাওয়ার প্রবণতা থাকে। এছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের ব্যবহার বেশি, যেগুলোতে সিসার উপস্থিতি থাকতে পারে।

বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লার মতে, “এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা বাহারি খেলনা বেশি পায় এবং পোলট্রি মুরগির মাংস বেশি খায় (যাদের খাবারে সিসা থাকতে পারে)। ফলে এসব উৎস থেকে তাদের শরীরে সিসা প্রবেশের সুযোগ বেশি থাকে।”

সিসা শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, “সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করতে পারে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা এবং আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়।” তিনি আরও জানান, অনেক সময় বাহ্যিকভাবে শিশুকে সুস্থ দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।

গবেষণায় বিভাগভেদে সিসার উপস্থিতির বড় পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা সবচেয়ে বেশি (৬৫.২%), এরপর রয়েছে সিলেট (৪৬.৭%) ও চট্টগ্রাম (৪২.১%)। অন্যদিকে, রাজশাহীতে এই হার সবচেয়ে কম (১৫.৯%)।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। সিসার বিষক্রিয়া প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসা নয়, বরং এর মূল উৎসগুলো শনাক্ত করে তা থেকে শিশুদের দূরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: প্রথম আলো।