যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার আলোচনার মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের আমদানি-রপ্তানির তথ্য দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ।
যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য ও ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।”
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ৩৪তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এর আওতায় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপের কথা জানানো হয়। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ১ আগস্ট কার্যকর হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ নয় মাস আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পর জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিতে (এআরটি) সই করে বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল—তুলা ও কৃত্রিম তন্তু—আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না বলে শর্ত যুক্ত করা হয়।
বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৭০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য এবং ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে।
চুক্তির ১১ দিন পর, ২০ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল হলেও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।
এআরটি চুক্তির আগে ২০২৪ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে মোট প্রায় ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাণিজ্য হয়।
এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এআরটি হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের (জানুয়ারি-জুন) তথ্যে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি হয়েছিল ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯ কোটি ৬ লাখ ডলারে। এই হিসাবে তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধান
উপকূলীয় এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, সরকার এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। “আমার নির্বাচনি এলাকা ভোলার একটি দ্বীপ, যেখানে বিশাল গ্যাসের মজুদ রয়েছে—৭ টিসিএফেরও বেশি প্রমাণিত গ্যাসের মজুদ রয়েছে। আমরা মনে করি, উপকূলীয় এলাকায়, বঙ্গোপসাগরে তেলের মজুদ থাকতে পারে।
“আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমার মানসম্পন্ন তেল ও গ্যাস পেয়েছে। আমি নিশ্চিত, উপযুক্ত প্রয়াস এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো হলে বাংলাদেশও একদিন তেলসমৃদ্ধ, গ্যাসসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে এবং ততদিনে আমাদের সব দুর্ভোগ কেটে যাবে।”
সম্পর্কের রসায়ন
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু অনুষ্ঠানে বলেন, “বাণিজ্যিক সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের জন্য মৌলিকভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে আর কাজ হবে না। “এমনকি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বলতে বোঝায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক—উভয়টিকেই।” এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মিন্টু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের এক নম্বর বাণিজ্য অংশীদার এবং এটি শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়।
“আমাদের সরকার এখন এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে, যেন আমেরিকান কোম্পানি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে—কেবল বিনিয়োগ করতেই নয়, বরং উৎপাদনেও আসতে। আমি চাই আমেরিকান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুক; কারণ আয়তনের দিক থেকে এটি ছোট দেশ হতে পারে, কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট নয়।”
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সম্পর্কের বিচারে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, কারণ ভাগ্যক্রমে আমি ১৯৭৯ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছিলাম; কিন্তু সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আমাকে এখন সেই মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়েছে।
“তবে আমার এখনো তিন ছেলে রয়েছে, যারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে। তারা সবাই আমেরিকান নাগরিক এবং তারা সব সময় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করে।
“তাই আমি আশা করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এবং এটিই হবে বন্ধুত্বের আসল পরীক্ষা।”
বিনিয়োগকারীরা যাতে লাইসেন্স ও অনুমতি পেতে ঝামেলায় না পড়েন, সে জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা ‘ওয়ান উইন্ডো’ চালু করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। কোনো মার্কিন কোম্পানি সমস্যায় পড়লে সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার স্পষ্ট: মার্কিন কোম্পানির জন্য সুযোগ বাড়ানো, মার্কিন কর্মীদের সমর্থন দেওয়া এবং মার্কিন রপ্তানি বৃদ্ধি। “বাণিজ্য তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন তা ন্যায়সংগত, পারস্পরিক এবং বাস্তব ফল দেয়।”
বর্তমান সময়কে মার্কিন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি ‘রোমাঞ্চকর সময়’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “এর প্রথম ধাপটি হলো পারস্পরিক বাণিজ্যের ওপর আমাদের চুক্তি—একত্রে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির রূপরেখা, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর একটি বাজি, একটি বিশ্বাস যে আমরা একসঙ্গে এই বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করতে পারি।”
জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের বড় চাহিদা রয়েছে, যা মেটাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো ‘প্রস্তুত’ বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত। তবে চুক্তির সাফল্য যে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সময়মতো পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধ, পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা এবং শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের বাধা কমানোর মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের আস্থা জোগায়।
“শ্রম অধিকার সুরক্ষা ও তা প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে এবং দায়িত্বশীল বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করবে।”
অ্যামচ্যাম সভাপতি বলেন, ‘‘তাদের সংগঠন মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে মিলে টানা ৩৪ বছর ধরে এই ট্রেড শোর আয়োজন করে আসছে।’’ মার্কিন কোম্পানিগুলো দেশে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এনেছে—এ তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “এটি গল্পের ইতিবাচক দিক, কিন্তু আপনি যখন এই ধরনের সংখ্যা অর্জন করতে চাইবেন অথবা বাংলাদেশে সত্যিই আরও ব্যবসা নিয়ে আসতে চাইবেন, তখন ব্যবসার জন্য সঠিক পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।
“আর অ্যামচ্যাম থেকে আমরা যে বিষয়টি বারবার তুলে ধরছি, তা হলো—জ্বালানি নিরাপত্তা।” অ্যামচ্যাম বাংলাদেশ ও মার্কিন দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তিন দিনের এই বাণিজ্য প্রদর্শনী শনিবার পর্যন্ত চলবে।
ট্রেড শোতে এবার সাতটি জোন করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন পণ্য কেনার জন্য ‘কার্নিভাল হল’, ‘হেরিটেজ কর্নার’ ও ‘স্টার্ট-আপ জোন’ রয়েছে। ৩৬টি কোম্পানি ও সাতটি স্টার্টআপ এ প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে। সব মিলিয়ে বুথ রয়েছে ৬৩টি।
অংশগ্রহণকারী বা প্রতিনিধিত্বকারী মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার, শেভরন, এক্সন মবিল, মেটলাইফ, সিটি গ্রুপ, মাস্টারকার্ড, ভিসা, কোলগেট-পামোলিভ, ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল, পেপসিকো, কস্টকো হোলসেল ক্লাব, পিপিজি, ইউপিএস ও কারগিল।
প্রথম ভোর ডেস্ক,ঢাকা 


















