ঢাকা ১২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইএমএফের পূর্বাভাস: মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে আবার ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ, তবে স্বস্তির সঙ্গে রয়েছে চ্যালেঞ্জও

২০২৬ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবেশী দেশ ভারতকে আবারও পেছনে ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে থাকলেও অর্থনীতির সার্বিক আকার, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সূচকে ভারত এখনও বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা চাপে রয়েছে বলেও উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

আইএমএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে, ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। এর আগে ২০২০ সালেও বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতকে পেছনে ফেলেছিল, যদিও পরবর্তীতে ভারত আবার এগিয়ে যায়। পূর্বাভাস বলছে, ২০২৭ এবং ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ এই সূচকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে, তবে ২০২৯ সালে ভারত আবারও ৩ হাজার ৬৬১ ডলার মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে শীর্ষস্থানে ফিরে যেতে পারে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে তৈরি পোশাকশিল্প, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শ্রমবাজারে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৪ সালের ১৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ভারতের ক্ষেত্রে উল্টো কমেছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচারে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। ২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যেখানে বাংলাদেশের জিডিপি হবে ৫০৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে ভারতের অবস্থান (১২,৯৯৮ ডলার) বাংলাদেশের (১০,৮৮৪ ডলার) চেয়ে ভালো। এর অর্থ হলো, আয় বেশি দেখালেও স্থানীয় বাজারদরের কারণে ভারতের মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে স্বস্তিদায়ক।

মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই সুখবরের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু সতর্কবার্তাও রয়েছে। আইএমএফের মতে, এ বছর ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকবে, যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ে সাধারণ মানুষ বাড়তি চাপে পড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাকশিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে কৃষি, প্রযুক্তি ও সেবানির্ভর বহুমুখী অর্থনীতির কারণে ভারত তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।

তবে সূচক ও পরিসংখ্যানের এই প্রতিযোগিতার বাইরে একটি জায়গায় উভয় দেশের চিত্রই অভিন্ন আর তা হলো ক্রমবর্ধমান সম্পদ বৈষম্য। দুই দেশেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত না হয়ে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায়, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় স্বীকৃতি হলেও, টেকসই উন্নয়নের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলাই এখন দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

 

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

আইএমএফের পূর্বাভাস: মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে আবার ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ, তবে স্বস্তির সঙ্গে রয়েছে চ্যালেঞ্জও

প্রকাশ : ০৪:৩৯:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

২০২৬ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবেশী দেশ ভারতকে আবারও পেছনে ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে থাকলেও অর্থনীতির সার্বিক আকার, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সূচকে ভারত এখনও বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা চাপে রয়েছে বলেও উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

আইএমএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে, ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। এর আগে ২০২০ সালেও বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতকে পেছনে ফেলেছিল, যদিও পরবর্তীতে ভারত আবার এগিয়ে যায়। পূর্বাভাস বলছে, ২০২৭ এবং ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ এই সূচকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে, তবে ২০২৯ সালে ভারত আবারও ৩ হাজার ৬৬১ ডলার মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে শীর্ষস্থানে ফিরে যেতে পারে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে তৈরি পোশাকশিল্প, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শ্রমবাজারে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৪ সালের ১৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ভারতের ক্ষেত্রে উল্টো কমেছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচারে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। ২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যেখানে বাংলাদেশের জিডিপি হবে ৫০৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে ভারতের অবস্থান (১২,৯৯৮ ডলার) বাংলাদেশের (১০,৮৮৪ ডলার) চেয়ে ভালো। এর অর্থ হলো, আয় বেশি দেখালেও স্থানীয় বাজারদরের কারণে ভারতের মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে স্বস্তিদায়ক।

মাথাপিছু আয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই সুখবরের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু সতর্কবার্তাও রয়েছে। আইএমএফের মতে, এ বছর ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকবে, যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ে সাধারণ মানুষ বাড়তি চাপে পড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাকশিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে কৃষি, প্রযুক্তি ও সেবানির্ভর বহুমুখী অর্থনীতির কারণে ভারত তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।

তবে সূচক ও পরিসংখ্যানের এই প্রতিযোগিতার বাইরে একটি জায়গায় উভয় দেশের চিত্রই অভিন্ন আর তা হলো ক্রমবর্ধমান সম্পদ বৈষম্য। দুই দেশেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত না হয়ে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায়, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় স্বীকৃতি হলেও, টেকসই উন্নয়নের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলাই এখন দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।