ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বল্পমেয়াদি’ যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ালেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট কোনো পথ পাচ্ছেন না তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মাত্র কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ শেষ করার যে দাবি ট্রাম্প শুরুতে করেছিলেন, সেখান থেকে সরে এসে চলমান কূটনৈতিক চেষ্টা ও হুমকি-পাল্টা হুমকির মুখে তিনি এখন চরম উভয় সংকটে পড়েছেন।
ট্রাম্পের সামনে এখন বিকল্প মূলত দুটি। একদিকে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যার ফলে যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের যে কর্তৃত্ব ছিল না, তাও তারা পেয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের সামনে রয়েছে নতুন করে সামরিক হামলা জোরদার করার হুমকি বাস্তবায়নের সুযোগ, যা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি প্রথম পথটি বেছে নেন, তবে যুদ্ধ শুরুর পর এটি হবে ইরানের সবচেয়ে বড় জয়। এর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ন্ত্রণ করার আনুষ্ঠানিক অধিকার পেয়ে যাবে ইরান।
অথচ এই প্রণালিতে ইরানের কর্তৃত্ব আটকানোর অঙ্গীকার করেই যুদ্ধে নেমেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। দ্বিতীয় পথ, অর্থাৎ নতুন করে বিমান হামলা শুরু করা ট্রাম্পের জন্য নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এর আগের বিমান হামলাগুলো তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে হামলা চালিয়ে সফল হওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
ট্রাম্প চাইলে চলমান এই অস্বস্তিকর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারেন। যার অর্থ দাঁড়াবে, ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি থাকবে এবং কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে সময়ে সময়ে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে মার্কিন বাহিনী।
তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার যে পূর্বাভাস ট্রাম্প দিয়েছিলেন, এই পথ বেছে নিলে সেখান থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় থাকবে না। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, “ট্রাম্পের সামনে থাকা সব বিকল্পই খারাপ। তবে তিনি হয়ত বুঝতে পেরেছেন যে এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সামলাতে কাউকে না কাউকে ছাড় দিতেই হবে, আর তা হয়ত হবে প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়া।”
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, যে কোনো ‘সাময়িক’ নৌপথ হতে হবে সম্পূর্ণ বাধাহীন, যেখানে কোনো একক পক্ষের তদারকি থাকবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোর দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং ইরানের কোনো শুল্ক বা নিয়ন্ত্রণ সেখানে চলবে না। তবে মার্কিন বাজারে তেলের চড়া দাম, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হ্রাস এবং আমেরিকার জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের কারণে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে।
ফলে রুবিওর অবস্থান নাকচ করে ট্রাম্প বড় আপসে যেতে পারেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান ও ওমানের প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরানের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে জুনে সই হওয়া আগের সমঝোতা স্মারক বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এবার নতুন চুক্তি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জুনের ওই খসড়ায় ইরানকে শুরুতে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা বা নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই ক্ষোভের জন্ম দেয়।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ও যে এই সংঘাত কোনো না কোনোভাবে জারি থাকবে, বিষয়টি প্রশাসন মেনে নিয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকেই কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ভোটের প্রচারের সময় বিদেশের যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে সেই যুদ্ধই তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের মাধ্যমে জয় দাবি করলেও, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের মত মূল লক্ষ্য অর্জনে তিনি স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছেন।
গত শনিবার ট্রাম্প জানান, পশ্চিম এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে তিনি ইরানে নতুন করে বড় হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। অবশ্য বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসার আশঙ্কাই তাকে পিছু হঠতে বাধ্য করেছে, যদিও ট্রাম্প তা অস্বীকার করেছেন। এর মধ্যেই লাস ভেগাসের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, “আমি সমঝোতাই পছন্দ করি, কারণ মানুষের প্রাণ নিতে চাই না। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে আমাদের তা করতেই হবে।”
ইরান ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ওয়াশিংটন নতুন করে বিমান হামলা চালালে পারস্য উপসাগরীয় মার্কিন মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা চালানো হবে। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ মনে করেন, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া পুরো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতাগুলো ওজন করে দেখছে।
এমনকি ট্রাম্পের যুদ্ধের সমর্থক কট্টরপন্থীরাও তাকে সতর্ক করছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’-এর গবেষক বেহনম বেন তালেবলু সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “নভেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি উভয় সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে ইরান। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত তাড়াহুড়ো না করে নিজেদের প্রভাবের সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করা।”
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















