ঢাকা ০৫:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে বাসিন্দারা

টানা ভারী বর্ষণ এবং সেই সঙ্গে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন শহরের বাসিন্দারা।

গতকাল সোমবার সকাল থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

এই বৃষ্টিতে নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে।

আবহাওয়া অফিস চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করেছে এবং পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে।

নগরের জলাবদ্ধ এলাকার জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। নিয়মিত গণপরিবহন না থাকায় আজ সকালে অফিসগামী যাত্রী এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে দেখা যায়। যাত্রীরা জানান, রিকশাচালকেরা এখন অতিরিক্ত ভাড়া চাচ্ছেন।

চকবাজারে কথা হলে সরকারি কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মূল সড়কে একটাও খালি রিকশা নেই। গতকাল সন্ধ্যায় আমাকে হাঁটু সমান পানি ভেঙে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এখানকার জলাবদ্ধতায় টিকে থাকা এখন ভাগ্যের খেলার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে জলাবদ্ধ রাস্তা দিয়ে চলাচল শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতালগঞ্জের বাসিন্দা মো. হাবিব বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেও আমাদের নিচতলায় পানি উঠে যায়। আজ সকালে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ছিল চরম কষ্টের বিষয়।

পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা ফজলুল হক জানান, কে বি আমান আলী রোড পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় তিনি অফিসে যেতে পারেননি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা আগেই জলাবদ্ধতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কারণ কাঠামোগত ধীরগতি, ‘ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা’ এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক স্থগিতাদেশের কারণে ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের চারটি বড় প্রকল্প এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনার সুস্পষ্ট অভাব এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে শুরু থেকেই এই মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ব্যাহত হয়েছে।

চারটি উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো সিডিএর খাল উন্নয়ন প্রকল্প। ৩৬টি খাল সংস্কারের মাধ্যমে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০১৭ সালে এটি শুরু হয়।

শুরুতে এর খরচ ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ধরা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে। একইভাবে কাজ শেষ করার সময়ও বারবার পিছিয়ে এখন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের এই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে সিডিএ সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শেষ থেকে মাঠপর্যায়ের সব কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, বৃষ্টির শুরুতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় সরকারের পক্ষ থেকে মাটির অস্থায়ী বাঁধগুলো অপসারণের নির্দেশের পর এই কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, তবে বাকি কাজ অক্টোবর মাস না আসা পর্যন্ত শুরু করা সম্ভব নয়। এতে চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও আগ্রাবাদের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এই বর্ষায় অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় থাকছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল ব্যয়ের উদ্যোগগুলো চট্টগ্রামের অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করছে।

আইইবির (চট্টগ্রাম কেন্দ্র) সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ব্যাখ্যা করেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা পাঁচ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়, অথচ অনেক আবাসিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন মিটার উপরে অবস্থিত।

তিনি উল্লেখ করেন, এই শহর তার প্রাকৃতিক জলাধার এবং মূল ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি হারিয়েছে, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

আজ সকালে কিছু এলাকা পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, নালা পরিষ্কারের আগাম পদক্ষেপ এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির কারণে সামগ্রিক জলাবদ্ধতা ৮০ শতাংশ কমেছে।

চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া পতেঙ্গা আকমল আলী সড়ক, বড় দিঘির পাড় হাটহাজারী সড়কসহ আরও অনেক জায়গায় নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শন ও অধিবেশন প্রত্যক্ষ করলেন রূপগঞ্জের কৃতি শিক্ষার্থীরা

চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে বাসিন্দারা

প্রকাশ : ০৪:৩৫:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

টানা ভারী বর্ষণ এবং সেই সঙ্গে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন শহরের বাসিন্দারা।

গতকাল সোমবার সকাল থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

এই বৃষ্টিতে নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে।

আবহাওয়া অফিস চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করেছে এবং পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে।

নগরের জলাবদ্ধ এলাকার জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। নিয়মিত গণপরিবহন না থাকায় আজ সকালে অফিসগামী যাত্রী এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে দেখা যায়। যাত্রীরা জানান, রিকশাচালকেরা এখন অতিরিক্ত ভাড়া চাচ্ছেন।

চকবাজারে কথা হলে সরকারি কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মূল সড়কে একটাও খালি রিকশা নেই। গতকাল সন্ধ্যায় আমাকে হাঁটু সমান পানি ভেঙে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এখানকার জলাবদ্ধতায় টিকে থাকা এখন ভাগ্যের খেলার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে জলাবদ্ধ রাস্তা দিয়ে চলাচল শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতালগঞ্জের বাসিন্দা মো. হাবিব বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেও আমাদের নিচতলায় পানি উঠে যায়। আজ সকালে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ছিল চরম কষ্টের বিষয়।

পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা ফজলুল হক জানান, কে বি আমান আলী রোড পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় তিনি অফিসে যেতে পারেননি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা আগেই জলাবদ্ধতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কারণ কাঠামোগত ধীরগতি, ‘ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা’ এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক স্থগিতাদেশের কারণে ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের চারটি বড় প্রকল্প এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনার সুস্পষ্ট অভাব এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে শুরু থেকেই এই মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ব্যাহত হয়েছে।

চারটি উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো সিডিএর খাল উন্নয়ন প্রকল্প। ৩৬টি খাল সংস্কারের মাধ্যমে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০১৭ সালে এটি শুরু হয়।

শুরুতে এর খরচ ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ধরা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে। একইভাবে কাজ শেষ করার সময়ও বারবার পিছিয়ে এখন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের এই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে সিডিএ সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শেষ থেকে মাঠপর্যায়ের সব কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, বৃষ্টির শুরুতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় সরকারের পক্ষ থেকে মাটির অস্থায়ী বাঁধগুলো অপসারণের নির্দেশের পর এই কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, তবে বাকি কাজ অক্টোবর মাস না আসা পর্যন্ত শুরু করা সম্ভব নয়। এতে চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও আগ্রাবাদের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এই বর্ষায় অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় থাকছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল ব্যয়ের উদ্যোগগুলো চট্টগ্রামের অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করছে।

আইইবির (চট্টগ্রাম কেন্দ্র) সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ব্যাখ্যা করেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা পাঁচ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়, অথচ অনেক আবাসিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন মিটার উপরে অবস্থিত।

তিনি উল্লেখ করেন, এই শহর তার প্রাকৃতিক জলাধার এবং মূল ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি হারিয়েছে, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

আজ সকালে কিছু এলাকা পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, নালা পরিষ্কারের আগাম পদক্ষেপ এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির কারণে সামগ্রিক জলাবদ্ধতা ৮০ শতাংশ কমেছে।

চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া পতেঙ্গা আকমল আলী সড়ক, বড় দিঘির পাড় হাটহাজারী সড়কসহ আরও অনেক জায়গায় নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।