বিগত সরকারের সময় প্রণীত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫ নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। আবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ত্রুটিপূর্ণ, একপেশে ও বৈষম্যমূলক এই পরিকল্পনার কারণে রাজধানীতে ভবন নির্মাণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন লাখ লাখ ভূমি মালিক, আবাসন ব্যবসায়ী ও সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতা। একই সঙ্গে বাড়ছে ফ্ল্যাটের দাম ও বাসাভাড়া, কমছে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতেই ঢাকার ভূমি মালিক সমিতি অভিযোগ করে জানায়, ড্যাপ ২০২২-২০৩৫-এর বৈষম্যমূলক ফার (এফএআর) নির্ধারণের কারণে রাজধানীর আবাসন উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুই লক্ষাধিক ভূমি মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি সংগঠনটির।
ফার কমায় কমেছে ভবনের উচ্চতা
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অভিযোগ, একই পরিমাণ জমিতে আগে যেখানে ১০ তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন সেখানে মাত্র ৫ তলা পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে জমির ব্যবহারযোগ্যতা কমে যাচ্ছে, কমছে মালিকদের আর্থিক সক্ষমতা। যৌথ উদ্যোগে ভবন নির্মাণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই।
তাদের ভাষ্য, ড্যাপের কারণে ভবনের উচ্চতা ও নির্মাণযোগ্য ফ্লোর স্পেস কমে যাওয়ায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য জায়গা হারাচ্ছেন ভূমি মালিকরা। এতে আবাসন ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
মানববন্ধনে ক্ষোভ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা। ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০০৮ অনুসারে ভবন নির্মাণের সুযোগ পুনর্বহালের দাবি জানান তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকার ভূমি মালিক সমিতির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. দেওয়ান এম এ সাজ্জাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে শতাধিক ভূমি মালিক অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, রাজধানীকে বাসযোগ্য নগরী গড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে একটি বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষায় ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।
তাদের দাবি, ড্যাপ ২০২২-২০৩৫-এ ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ এলাকাকে পরিকল্পিত জোন হিসেবে রেখে সুউচ্চ ভবনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশ এলাকাকে ‘অপরিকল্পিত এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা নাগরিকদের মধ্যে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।
সাতারকুল-বাড্ডায় নতুন জলাশয় প্রস্তাবে উদ্বেগ
সংশোধিত ড্যাপে সাতারকুল ও বাড্ডা মৌজার বড় অংশে নতুন করে জলাশয় ও খালের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করায় ক্ষোভ বাড়ছে ভূমি মালিকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, এই প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং পূর্ববর্তী পরিকল্পনারও পরিপন্থী।
ভূমি মালিকরা জানান, ২০১০-২০১৫ মেয়াদের ড্যাপে সাতারকুল ও বাড্ডাকে ‘আরবান রেসিডেন্সিয়াল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ২০০৪ সাল থেকে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে জমি ক্রয়, প্লট উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও ভবন নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আবাসিক স্থাপনা।
কিন্তু নতুন ড্যাপে হঠাৎ করে এসব এলাকায় জলাশয় ও খালের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করায় হাজারো মানুষের বিনিয়োগ ও বসবাস অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
কোথাও জলাশয় ভরাট, কোথাও আবাসিকে বাধা
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ২০১০-২০১৫ মেয়াদের ড্যাপে যেসব এলাকায় জলাশয় ছিল, পরবর্তী পরিকল্পনায় সেগুলোর কিছু অংশ আবাসিক এলাকায় রূপান্তর করা হয়েছে। বিশেষ করে মাদানী অ্যাভিনিউ, ৩০০ ফিট সংযোগ সড়ক সংলগ্ন বড় কাঠালদিয়া, রূপগঞ্জের নাওরা, বাঘব ও ডুমনি মৌজার বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় থাকা সত্ত্বেও সেখানে আবাসিক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক উন্নয়ন হওয়া সাতারকুল ও বাড্ডার মতো এলাকাকে নতুন করে জলাশয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ড্যাপের নীতিগত সামঞ্জস্য ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজউকের অবস্থান
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ড্যাপ প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা হয়েছে। কেউ বলছেন ভবনের উচ্চতা বেড়েছে, আবার কেউ বলছেন কমেছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “২০০৮ সালের নিয়মে এখন আর পুরোপুরি ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কৃষিজমি ও জলাশয় দ্রুত কমে যাচ্ছে। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না, বাসযোগ্য শহরও নিশ্চিত করতে হবে।”
সাতারকুল-বাড্ডায় নতুন জলাশয় প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিকরা আবেদন করলে বিষয়টি রিভিউ কমিটির মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে। কোথাও ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
টিডিআর নিয়েও অসন্তোষ
ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার বা কৃষিজমির মালিকদের জন্য ‘ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস’ (টিডিআর) ব্যবস্থার কথা বলা হলেও এটিকেও জটিল ও বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখছেন অনেক ভূমি মালিক।
তাদের অভিযোগ, বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প সুবিধা না দিয়ে টিডিআরের মতো জটিল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ায় অনেকেই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত, অংশগ্রহণমূলক এবং বৈষম্যহীন। অন্যথায় আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথম ভোর ডেস্ক,ঢাকা 


















