ঢাকা ০৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৫ পয়সার ঋণ শোধে ৫৫ বছর ধরে বন্ধুর খোঁজে শিল্পপতি সূফী মিজান

পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সূফী মিজানুর রহমান।

ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দিতে ট্রেনভাড়ার ২৫ পয়সা ছিল না, বন্ধুই দিয়েছিলেন সেই টাকা। সেই পরীক্ষায় চাকরি, এরপর চট্টগ্রামে নতুন জীবন—দীর্ঘ চার দশকে ৩৪টিরও বেশি ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক সূফী মিজানুর রহমান। কিন্তু বন্ধুর সেই ২৫ পয়সার ঋণ আজও ভুলতে পারেননি তিনি।

জীবনের শুরুতে মাত্র ২৫ পয়সার অভাবে ঢাকায় গিয়ে চাকরির পরীক্ষা দেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় বন্ধুর দেওয়া ২৫ পয়সাই বদলে দিয়েছিল সূফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের জীবনের গতিপথ। চাকরি, ব্যবসা আর কঠোর পরিশ্রমের পথ পেরিয়ে আজ তিনি দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।

জীবনের ৮৪ বছরে এসে অর্থ-সম্পদ, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কোনো কিছুই তাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি সেই ২৫ পয়সার কথা। বরং হারিয়ে যাওয়া সেই বন্ধু আমিনকে খুঁজে বের করে তার পরিবারের কাছে ওই ঋণ পরিশোধ করতে চান এই শিল্পপতি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পথচলা

সময়টা ১৯৬২ সাল। নারায়ণগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. আলাউদ্দিনের ছোট ভাই আমিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় সূফী মিজানুর রহমানের। আমিনের বাড়ি ছিল যশোরে। বড় ভাইয়ের চাকরির সুবাদে তারা তখন নারায়ণগঞ্জে বসবাস করতেন।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জেই থাকতেন মিজানুর রহমান। সরকারি তোলারাম কলেজের সান্ধ্যকালীন বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন তিনি।

ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা শেষে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুর সঙ্গে বসে হোমওয়ার্ক করতেন। এমনই এক সন্ধ্যায় আমিন তার কাছে একটি চাকরির খবর নিয়ে আসেন। জানান, ব্যাংক অব পাকিস্তানের মতিঝিল শাখায়—যা বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের অংশ—নিয়োগ পরীক্ষা হবে।

বন্ধুকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই যাবি নাকি?’

চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও মিজানুর রহমানের সামনে তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঢাকায় যাওয়ার ভাড়া। তিনি বন্ধুকে বলেন, ‘দোস্ত, আমি যে ঢাকায় গিয়ে মতিঝিলে পরীক্ষা দেব, আমার তো ভাড়া নেই, টাকা নেই।’

সেই সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার ট্রেনের ভাড়া ছিল মাত্র আট আনা, অর্থাৎ ২৫ পয়সা। বন্ধুর কথা শুনে এক মুহূর্তও দেরি করেননি আমিন। নিজের পকেট থেকে ২৫ পয়সা বের করে মিজানুর রহমানের হাতে তুলে দেন।

সেই ২৫ পয়সাই হয়ে ওঠে তার জীবনের মোড় ঘোরানো অর্থ।

দুজন একসঙ্গে ট্রেনে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। মতিঝিলে গিয়ে দুজনেই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। ভাগ্যের পরিহাস—পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পান মিজানুর রহমান; কিন্তু তার বন্ধু আমিন চাকরিটি পাননি।

১৯৬৫ সালে ব্যাংকের চাকরির সুবাদে মিজানুর রহমান চট্টগ্রামে চলে আসেন। এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমিনের সঙ্গে। সময়ের স্রোতে সেই বন্ধু হারিয়ে গেলেও তার দেওয়া ২৫ পয়সার স্মৃতি থেকে যায় মিজানুর রহমানের মনে।

ব্যাংকের চাকরি থেকে শিল্প সাম্রাজ্য

পরবর্তীতে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে মাত্র ১ হাজার ৪৮৩ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন সূফী মিজানুর রহমান। টায়ার ও গুঁড়ো দুধের বাণিজ্যের মাধ্যমে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবন।

ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। স্টিল, ফ্লোট গ্লাস, শিপব্রেকিং, অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে ওঠে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে পিএইচপি ফ্যামিলির অধীনে ৩৪টিরও বেশি ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত তিনি।

বিশাল এই শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি না হওয়ার দৃষ্টান্ত এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিও তার ব্যবসায়িক জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন।

সততা, দূরদর্শিতা ও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ প্রদান করে।

তবু ভুলতে পারেননি ২৫ পয়সা

জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি সফল শিল্পপতি। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর একটি যে ২৫ পয়সার সঙ্গে জড়িয়ে, সেটি ভুলে যাননি সূফী মিজান।

বন্ধু আমিনের দেওয়া ওই অর্থ শুধু একটি ট্রেনের টিকিট কেনার টাকা ছিল না; সেটিই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সেই চাকরির পরীক্ষার কেন্দ্রে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে তার নতুন জীবনের পথচলা।

আর সেই কারণেই ৫৫ বছর পরও বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তার ঋণ শোধ করতে চান তিনি।

পিএইচপি ফ্যামিলির ডিরেক্টর ও সূফী মিজানুর রহমানের ছেলে আমির হোসেন সোহেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই বন্ধুর কারণেই তার বাবা ব্যাংকে চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। আর এই চট্টগ্রামেই তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে।

তার ভাষায়, বাবার আজকের যত অর্জন, তার পেছনে ওই বন্ধুর একটি পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই বাবা এখনও বন্ধুকে খুঁজে বেড়ান।

হারানো বন্ধুর সন্ধানে পরিবার

বন্ধু আমিনকে খুঁজে পেতে কয়েক বছর আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন সূফী মিজানুর রহমান। সম্প্রতি সেই পুরোনো বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানেও এখনো সেই বন্ধুর সন্ধান মেলেনি। পরিবারের ধারণা, আমিন হয়তো আর জীবিত নেই। কিন্তু তাতেও অনুসন্ধান থামাতে চান না সূফী মিজান।

আমির হোসেন সোহেল জানান, তাদের অনুসন্ধানে মনে হচ্ছে সেই বন্ধু হয়তো আর বেঁচে নেই। তবে তার বাবার নির্দেশ খুব স্পষ্ট—বন্ধুকে না পাওয়া গেলেও অন্তত তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করতে হবে।

কারণ, ৫৫ বছর আগের সেই ২৫ পয়সা তার কাছে নিছক কোনো টাকা নয়। সেটি একজন বন্ধুর বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সহযোগিতার স্মারক—যে সহযোগিতা হয়তো না পেলে বদলে যেত তার পুরো জীবন।

আজ তাই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা, অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান আর রাষ্ট্রীয় সম্মানের আড়ালেও সূফী মিজানের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে আছে সেই ছোট্ট ঋণ—বন্ধুর দেওয়া ২৫ পয়সা।

জনপ্রিয় সংবাদ

২৫ পয়সার ঋণ শোধে ৫৫ বছর ধরে বন্ধুর খোঁজে শিল্পপতি সূফী মিজান

২৫ পয়সার ঋণ শোধে ৫৫ বছর ধরে বন্ধুর খোঁজে শিল্পপতি সূফী মিজান

প্রকাশ : ০৯:২২:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দিতে ট্রেনভাড়ার ২৫ পয়সা ছিল না, বন্ধুই দিয়েছিলেন সেই টাকা। সেই পরীক্ষায় চাকরি, এরপর চট্টগ্রামে নতুন জীবন—দীর্ঘ চার দশকে ৩৪টিরও বেশি ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক সূফী মিজানুর রহমান। কিন্তু বন্ধুর সেই ২৫ পয়সার ঋণ আজও ভুলতে পারেননি তিনি।

জীবনের শুরুতে মাত্র ২৫ পয়সার অভাবে ঢাকায় গিয়ে চাকরির পরীক্ষা দেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় বন্ধুর দেওয়া ২৫ পয়সাই বদলে দিয়েছিল সূফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের জীবনের গতিপথ। চাকরি, ব্যবসা আর কঠোর পরিশ্রমের পথ পেরিয়ে আজ তিনি দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।

জীবনের ৮৪ বছরে এসে অর্থ-সম্পদ, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কোনো কিছুই তাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি সেই ২৫ পয়সার কথা। বরং হারিয়ে যাওয়া সেই বন্ধু আমিনকে খুঁজে বের করে তার পরিবারের কাছে ওই ঋণ পরিশোধ করতে চান এই শিল্পপতি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পথচলা

সময়টা ১৯৬২ সাল। নারায়ণগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. আলাউদ্দিনের ছোট ভাই আমিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় সূফী মিজানুর রহমানের। আমিনের বাড়ি ছিল যশোরে। বড় ভাইয়ের চাকরির সুবাদে তারা তখন নারায়ণগঞ্জে বসবাস করতেন।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জেই থাকতেন মিজানুর রহমান। সরকারি তোলারাম কলেজের সান্ধ্যকালীন বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন তিনি।

ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা শেষে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুর সঙ্গে বসে হোমওয়ার্ক করতেন। এমনই এক সন্ধ্যায় আমিন তার কাছে একটি চাকরির খবর নিয়ে আসেন। জানান, ব্যাংক অব পাকিস্তানের মতিঝিল শাখায়—যা বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের অংশ—নিয়োগ পরীক্ষা হবে।

বন্ধুকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই যাবি নাকি?’

চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও মিজানুর রহমানের সামনে তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঢাকায় যাওয়ার ভাড়া। তিনি বন্ধুকে বলেন, ‘দোস্ত, আমি যে ঢাকায় গিয়ে মতিঝিলে পরীক্ষা দেব, আমার তো ভাড়া নেই, টাকা নেই।’

সেই সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার ট্রেনের ভাড়া ছিল মাত্র আট আনা, অর্থাৎ ২৫ পয়সা। বন্ধুর কথা শুনে এক মুহূর্তও দেরি করেননি আমিন। নিজের পকেট থেকে ২৫ পয়সা বের করে মিজানুর রহমানের হাতে তুলে দেন।

সেই ২৫ পয়সাই হয়ে ওঠে তার জীবনের মোড় ঘোরানো অর্থ।

দুজন একসঙ্গে ট্রেনে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। মতিঝিলে গিয়ে দুজনেই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। ভাগ্যের পরিহাস—পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পান মিজানুর রহমান; কিন্তু তার বন্ধু আমিন চাকরিটি পাননি।

১৯৬৫ সালে ব্যাংকের চাকরির সুবাদে মিজানুর রহমান চট্টগ্রামে চলে আসেন। এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমিনের সঙ্গে। সময়ের স্রোতে সেই বন্ধু হারিয়ে গেলেও তার দেওয়া ২৫ পয়সার স্মৃতি থেকে যায় মিজানুর রহমানের মনে।

ব্যাংকের চাকরি থেকে শিল্প সাম্রাজ্য

পরবর্তীতে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে মাত্র ১ হাজার ৪৮৩ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন সূফী মিজানুর রহমান। টায়ার ও গুঁড়ো দুধের বাণিজ্যের মাধ্যমে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবন।

ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। স্টিল, ফ্লোট গ্লাস, শিপব্রেকিং, অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে ওঠে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে পিএইচপি ফ্যামিলির অধীনে ৩৪টিরও বেশি ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত তিনি।

বিশাল এই শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি না হওয়ার দৃষ্টান্ত এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিও তার ব্যবসায়িক জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন।

সততা, দূরদর্শিতা ও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ প্রদান করে।

তবু ভুলতে পারেননি ২৫ পয়সা

জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি সফল শিল্পপতি। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর একটি যে ২৫ পয়সার সঙ্গে জড়িয়ে, সেটি ভুলে যাননি সূফী মিজান।

বন্ধু আমিনের দেওয়া ওই অর্থ শুধু একটি ট্রেনের টিকিট কেনার টাকা ছিল না; সেটিই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সেই চাকরির পরীক্ষার কেন্দ্রে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে তার নতুন জীবনের পথচলা।

আর সেই কারণেই ৫৫ বছর পরও বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তার ঋণ শোধ করতে চান তিনি।

পিএইচপি ফ্যামিলির ডিরেক্টর ও সূফী মিজানুর রহমানের ছেলে আমির হোসেন সোহেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই বন্ধুর কারণেই তার বাবা ব্যাংকে চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। আর এই চট্টগ্রামেই তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে।

তার ভাষায়, বাবার আজকের যত অর্জন, তার পেছনে ওই বন্ধুর একটি পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই বাবা এখনও বন্ধুকে খুঁজে বেড়ান।

হারানো বন্ধুর সন্ধানে পরিবার

বন্ধু আমিনকে খুঁজে পেতে কয়েক বছর আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন সূফী মিজানুর রহমান। সম্প্রতি সেই পুরোনো বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানেও এখনো সেই বন্ধুর সন্ধান মেলেনি। পরিবারের ধারণা, আমিন হয়তো আর জীবিত নেই। কিন্তু তাতেও অনুসন্ধান থামাতে চান না সূফী মিজান।

আমির হোসেন সোহেল জানান, তাদের অনুসন্ধানে মনে হচ্ছে সেই বন্ধু হয়তো আর বেঁচে নেই। তবে তার বাবার নির্দেশ খুব স্পষ্ট—বন্ধুকে না পাওয়া গেলেও অন্তত তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করতে হবে।

কারণ, ৫৫ বছর আগের সেই ২৫ পয়সা তার কাছে নিছক কোনো টাকা নয়। সেটি একজন বন্ধুর বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সহযোগিতার স্মারক—যে সহযোগিতা হয়তো না পেলে বদলে যেত তার পুরো জীবন।

আজ তাই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা, অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান আর রাষ্ট্রীয় সম্মানের আড়ালেও সূফী মিজানের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে আছে সেই ছোট্ট ঋণ—বন্ধুর দেওয়া ২৫ পয়সা।