থানায় গিয়ে কোনো নাগরিক হয়রানির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নবনিযুক্ত কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার।
তিনি বলেছেন, আইন প্রয়োগের নামে কাউকে প্রহার বা অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না। পুলিশকে আইনের মধ্যে থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একইসঙ্গে থানাগুলোকে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, থানায় কোনো দালালের অস্তিত্ব থাকবে না। যদি কোনো থানায় দালালের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অফিসারের কারণে জনবান্ধব পুলিশিং বাধাগ্রস্ত হলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে কতদিন দায়িত্বে আছেন, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার না করা হয়। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু কারও গায়ে হাত তোলা বা অতিরিক্ত বল প্রয়োগের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “বিগত সময়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আমরা এটা কঠোরভাবে দেখবো। আমার সময়ে কেউ এমন করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিশোর গ্যাং দমনে ডিএমপির অবস্থান কঠোর জানিয়ে মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্য ও গ্যাং লিডারদের তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে তিনি বলেন, “শুধু পুলিশের পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিক, জনগণ ও পুলিশ একসঙ্গে কাজ করলে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।”
শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ অভিযানের কথাও তুলে ধরেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি জানান, গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এ পর্যন্ত ২ হাজার ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৬ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ, ৮৪৭ জন মাদক কারবারি এবং ৬৭০ জন ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী রয়েছে।
তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যে দলেরই হোক, অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাম্প্রতিক সময়ে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা, কক্সবাজার থেকে বাবর চিনমন এবং পল্লবীর শিশু হত্যা মামলার আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের বিষয়ও উল্লেখ করেন কমিশনার।
তিনি বলেন, “পল্লবীর মর্মান্তিক ঘটনায় সাত ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুগদায় সাত টুকরো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মূল আসামি তাসলিমাকেও নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
মব কালচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা শহরে কোনো মব কালচার চলবে না। যেখানেই এমন ঘটনা ঘটবে, সেখানেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শাহ আলী মাজারে সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা সঙ্গে সঙ্গে মামলা নিয়েছি এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি।”
থানা ও ফাঁড়ির অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়েও কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি জানান, রাজধানীর ৫০টি থানার মধ্যে ২৩টি নিজস্ব ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। সাতটি থানার ভবন সংস্কারের কাজ চলছে এবং বাকি থানাগুলো অস্থায়ী ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, থানাগুলোর যানবাহন সংকট নিরসনে সরকার নতুন যানবাহন কেনার অনুমোদন দিয়েছে। দ্রুত ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং নষ্ট গাড়িগুলোও দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ডিএমপির উদ্যোগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে এআই ক্যামেরা চালু করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এই প্রযুক্তি আরও বিস্তৃত করা হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এটি একদিনে তৈরি হওয়া সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় এটি বিস্তার লাভ করেছে। এর পেছনে বড় সিন্ডিকেটও কাজ করেছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৮টি অভিযানে ব্যাটারি জব্দ, ডাম্পিং ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবে এটি পুলিশের একার পক্ষে সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উগ্রবাদ দমনে পুলিশের অবস্থান প্রসঙ্গে মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা ‘জঙ্গি’ শব্দের পরিবর্তে ‘উগ্রবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করছি। ঢাকায় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। কোথাও কোনো তথ্য পেলেই তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত নগরায়ন, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বস্তি এলাকায় অপরাধপ্রবণতা, সাইবার অপরাধ, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, কিশোর গ্যাং ও মাদক—এসবই বর্তমানে পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে গবেষণা, প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি নিরাপদ মহানগরী গড়ে তুলতে ডিএমপি কাজ করছে বলে জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ছোট অপরাধের তথ্যও পুলিশকে জানাতে হবে। কারণ ছোট অপরাধ থেকেই বড় অপরাধের জন্ম হয়। জনগণ, সাংবাদিক ও সব সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া নিরাপদ ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
প্রথম ভোর ডেস্ক,ঢাকা 


















