ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রূপগঞ্জে তিন শতাধিক স্পটে মাদক বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম প্রশাসন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় তিন শতাধিক স্থানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযান চালানো হলেও কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না মাদক বাণিজ্য। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিস্তার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চনপাড়া পুনর্বাসনকেন্দ্রেই রয়েছে শতাধিক মাদকের স্পট, যা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩০ থেকে ৩২টি সিন্ডিকেট। গোলাকান্দাইল সাওঘাট এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনকে মাদক মজুদের নিরাপদ গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া গোলাকান্দাইল ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকা, উত্তরপাড়া বালুরমাঠ, কালী মজলিসের বাগ, মুসলিমপাড়া কাঁঠালবাগান, তারাবো পৌরসভার হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, বরাবো, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নগরপাড়া, বাগবাড়ী, দেলপাড়া, নয়ামাটি, কামশাইর ও বরুণা এলাকায় মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

এছাড়া গোয়ালপাড়া ও পূর্বাচল উপশহরসহ রাতালদিয়া, সাওঘাট, পূর্ব দরিকান্দি, মাছিমপুর, রূপসী সুইসগেট, কালাদি, আতলাশপুর, হাটাবো টেকপাড়া, গন্ধর্বপুর ও দক্ষিণ মাসাবো এলাকায় মাদক ব্যবসা এখন রীতিমতো জমজমাট। স্থানীয়ভাবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

চনপাড়ায় সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেটে কয়েকশ নারীও জড়িত বলে জানা গেছে। মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বেদে বহর, লবণবাহী সাম্পান, এমনকি সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজও। হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিলের পাশাপাশি স্কাফ, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইনজেকশনসহ নানা ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে আধুরিয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত কয়েক লাখ শ্রমিকের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের ভাড়া করা বাসা ও মেসে সরাসরি গিয়ে মাদক সরবরাহ করছে ব্যবসায়ীরা।

মাদক প্রবেশের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বালু নদ। নদীপথে পুলিশের টহল না থাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলারযোগে সহজেই মাদক আনা হচ্ছে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজের মাধ্যমেও মাদক আসছে। স্থলপথে এশিয়ান হাইওয়ে ব্যবহার করে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জ থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে রূপগঞ্জে প্রবেশ করছে মাদক। ভুলতা এলাকাকে মাদকের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

চনপাড়া বস্তিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত এক যুগে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় অন্তত ২০ থেকে ২২ জন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শুরুর আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে। মাদক বহনে শিশু-কিশোর ও নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তারাবো পৌরসভার মাদকবিরোধী কমিটির আহ্বায়ক আলহাজ মোজাম্মেল হক প্রধান বলেন, “মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। তবে চনপাড়া বস্তি এলাকা অত্যন্ত ঘিঞ্জি হওয়ায় অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীরা আগেই পালিয়ে যায়।”

নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কাজ করছে। আশা করছি, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, “মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দলের কেউ জড়িত থাকলে তাকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”

জনপ্রিয় সংবাদ

রূপগঞ্জে তিন শতাধিক স্পটে মাদক বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম প্রশাসন

রূপগঞ্জে তিন শতাধিক স্পটে মাদক বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম প্রশাসন

প্রকাশ : ০৭:৩২:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় তিন শতাধিক স্থানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযান চালানো হলেও কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না মাদক বাণিজ্য। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিস্তার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চনপাড়া পুনর্বাসনকেন্দ্রেই রয়েছে শতাধিক মাদকের স্পট, যা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩০ থেকে ৩২টি সিন্ডিকেট। গোলাকান্দাইল সাওঘাট এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনকে মাদক মজুদের নিরাপদ গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া গোলাকান্দাইল ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকা, উত্তরপাড়া বালুরমাঠ, কালী মজলিসের বাগ, মুসলিমপাড়া কাঁঠালবাগান, তারাবো পৌরসভার হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, বরাবো, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নগরপাড়া, বাগবাড়ী, দেলপাড়া, নয়ামাটি, কামশাইর ও বরুণা এলাকায় মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

এছাড়া গোয়ালপাড়া ও পূর্বাচল উপশহরসহ রাতালদিয়া, সাওঘাট, পূর্ব দরিকান্দি, মাছিমপুর, রূপসী সুইসগেট, কালাদি, আতলাশপুর, হাটাবো টেকপাড়া, গন্ধর্বপুর ও দক্ষিণ মাসাবো এলাকায় মাদক ব্যবসা এখন রীতিমতো জমজমাট। স্থানীয়ভাবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

চনপাড়ায় সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেটে কয়েকশ নারীও জড়িত বলে জানা গেছে। মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বেদে বহর, লবণবাহী সাম্পান, এমনকি সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজও। হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিলের পাশাপাশি স্কাফ, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইনজেকশনসহ নানা ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে আধুরিয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত কয়েক লাখ শ্রমিকের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের ভাড়া করা বাসা ও মেসে সরাসরি গিয়ে মাদক সরবরাহ করছে ব্যবসায়ীরা।

মাদক প্রবেশের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বালু নদ। নদীপথে পুলিশের টহল না থাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলারযোগে সহজেই মাদক আনা হচ্ছে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজের মাধ্যমেও মাদক আসছে। স্থলপথে এশিয়ান হাইওয়ে ব্যবহার করে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জ থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে রূপগঞ্জে প্রবেশ করছে মাদক। ভুলতা এলাকাকে মাদকের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

চনপাড়া বস্তিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত এক যুগে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় অন্তত ২০ থেকে ২২ জন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শুরুর আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে। মাদক বহনে শিশু-কিশোর ও নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তারাবো পৌরসভার মাদকবিরোধী কমিটির আহ্বায়ক আলহাজ মোজাম্মেল হক প্রধান বলেন, “মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। তবে চনপাড়া বস্তি এলাকা অত্যন্ত ঘিঞ্জি হওয়ায় অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীরা আগেই পালিয়ে যায়।”

নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কাজ করছে। আশা করছি, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, “মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দলের কেউ জড়িত থাকলে তাকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”