ঢাকা ১২:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুত্রের কাছে পিতার আবেগময় অনন্য চিঠি

আহনাফ শারার
সিএসই, ৭ম সেমিস্টার
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যামব্রিজ, যুক্তরাজ্য

তোমার কাছে আমার কিছু জরুরি কথা

শোন বাবা আমার,

তোমাকে কিছু কথা বলা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছি। হয়তো সেগুলো আবারও ফিরে আসবে। তুমি বিষয়গুলো সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে—এই প্রত্যাশা রাখি।

১.

তোমার এখন যে বয়স, এই বয়সে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক কিছু অস্বীকার করে নতুন করে সাজানোর ইচ্ছা থাকা খুবই স্বাভাবিক। মতের ভিন্নতা সভ্যতারই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সমালোচনা মানেই বিদ্বেষ নয়; বরং চিন্তা ও চেতনার খোরাক।

মৃত্যু, দিবা-রাত্রি, সূর্যের উদয়-অস্ত—এমন গুটিকয়েক বিষয় ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সবকিছুই অবস্থান ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীতে চিরস্থায়ী সত্য বলে তেমন কিছু নেই। আজকের সত্য বা মিথ্যা সময়ের প্রবাহে গিয়ে বদলে যেতে পারে।

যারা নতুন করে সাজানোর চিন্তা করে, তারা একদিন অনেক বড় কিছু অর্জন করতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন ঘটাতে প্রয়োজন ধৈর্য, বিনয় এবং অন্যকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার ক্ষমতা। বর্তমানের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎকে সুসংগঠিত করতে হয়।

অন্যদিকে, যারা অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক, বর্তমানকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং অন্যকে অসম্মান করে, তারা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। একসময় হারিয়ে যায়। ইতিহাস তার অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে রেখেছে।

মনে রাখবে—শিক্ষিত মানেই জ্ঞানী নয়। জ্ঞানী হতে হলে প্রচলিত শিক্ষার বাইরে আরও অনেক কিছু জানতে হয়, সাধনা করতে হয় এবং সর্বোপরি মানুষ হয়ে উঠতে হয়। সেটা তোমার আচরণে, জীবনযাপনে এবং উদযাপনে প্রকাশ পাবে।

দৃশ্যত মানুষ অনেকেই; কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠা খুব কঠিন। জ্ঞান, বিবেক, মানবিকতা ও সংবেদনশীলতাই মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানুষ করে তোলে।

তোমার মধ্যে অনেক ইতিবাচক দিক আমি দেখেছি। বাবা হিসেবে তাই মাঝে মাঝে শঙ্কা হয়—এই ভালো দিকগুলো যদি কোনোদিন হারিয়ে যায়!

হেসো না। সত্যিকারের বাবা-মা বোধহয় এমনই চিন্তা করেন।

আর একটা কথা মনে রেখো—সমর্পণ মানে বিসর্জন কিংবা পরাজয় নয়। আপাতদৃষ্টিতে ছোট ছোট পরাজয় অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি জয়ের নিয়ামক হয়ে ওঠে।

তর্কে জিতে সাময়িক নীরবতা পাওয়া যায়, কিন্তু অপরজন শান্তি পায় না। তর্কে জিততে গিয়ে অনেকেই সত্যকে দুর্বল করেছে, সম্পর্ককে অস্থায়ী করেছে, এমনকি চিরদিনের জন্য প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। তোমার আশপাশে এমন অনেক জ্বলন্ত উদাহরণ আছে।

২.

নিজস্ব পরিবেশে একাকী বেড়ে ওঠার অনেক ভালো দিক আছে, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। যেমন—মানুষের সামনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করা, সহজে মিশতে না পারা, চিন্তার পরিসর সীমিত হয়ে যাওয়া, নিজের বিশ্বাসে অতিরিক্ত অটল থাকা এবং নতুন বা ভিন্ন কিছু সহজে গ্রহণ করতে না পারা।

আমার ছোটবেলাও অনেকটা এভাবেই কেটেছে।

মা ও মাতৃত্ব যেমন এক নয়, ঠিক তেমনি পিতা ও পিতৃত্বও এক নয়। একজন মানুষ পিতা হতে পারেন, কিন্তু পিতৃত্ব অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অনেক ত্যাগ, কষ্ট, মমতা ও সাধনার মধ্য দিয়ে পিতৃত্ব অর্জন করতে হয়।

পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হলো আপনত্ব। আর আপনত্ব তৈরি হয় প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, কখনো হয়তো বর্জনীয়—সব ধরনের আলাপচারিতায়; নিয়মিত যোগাযোগে, কথোপকথনে, ভালোবাসায় এবং স্পর্শে।

তোমার মা এবং আমি সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি বা ভবিষ্যতে কতটুকু পারব, সেটা আমরা বলতে পারি না। সময়ই তার উত্তর দেবে।

সন্তানেরা মা-বাবার সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে পারে, মা-বাবাকে নয়।

শিক্ষা কিংবা কর্মজীবন মা-বাবা ও সন্তানের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে, কিন্তু মনের মধ্যে নয়। অবস্থানগত কারণে তুমি কাছে থাকো কিংবা দূরে—যেখানেই থাকো, যদি মনের দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, তাহলে মূল সম্পর্কটিই একসময় হারিয়ে যায়।

টাকা দিয়ে নিরাপদ বাড়ি কেনা যায়, কিন্তু ঘর তৈরি করা যায় না।

স্নেহ, মায়া, মমতা, স্পর্শ, আদর ও ভালোবাসা ছাড়া ঘর হয় না। এখানে ঘর বলতে চার দেয়ালে ঘেরা কোনো কাঠামোকে বোঝাচ্ছি না; মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের বন্ধনের নামই ঘর।

৩.

আমার কাছে মনে হয়েছে, কিছু কিছু বিষয়ে তোমার চিন্তা ও চেতনা একই জায়গায় খুব অনড় ও অটল। এটা ভালো। নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থাকা জরুরি।

কিন্তু তার প্রকাশ সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় নমনীয় হয় না।

আমি আগেই বলেছি—যেহেতু পৃথিবীতে চিরস্থায়ী বলে তেমন কিছু নেই, তাই সবসময় নিজের অবস্থানে অনড় থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কখনো কখনো অপরকে সম্মান করে এক পা পিছিয়ে আসাও প্রজ্ঞার পরিচয়।

বোকা মানুষই সাধারণত ভাবে, নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়া যাবে না। আমার ছেলে নিশ্চয়ই বোকা নয়—এটাই আমার বিশ্বাস।

মানুষের জীবনে সমস্যা আসবে, বিপদ আসবে, একাকীত্ব আসবে; ভয়েরও উৎস তৈরি হবে। এগুলো জীবনেরই অংশ।

ভয়ের কাছে সাময়িকভাবে আত্মসমর্পণ করলে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা পাওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না। বরং পরবর্তী আরও বড় ভয়ের ভিত্তি তৈরি হয়।

তাই ভয়কে জয় করে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। এটাই জীবনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

যারা ভয়কে জয় করতে পারে না, তারা হতাশ হয়, হেরে যায়; সফল ও সার্থক হতে পারে না।

আর একটা কথা—পৃথিবীতে আলাদা করে ‘সুখ’ বলে হয়তো কিছু নেই। দুঃখের মধ্য দিয়েই মাঝেমধ্যে সুখানুভূতি আসে। তাই জীবনকে উদযাপন করতে হয়।

তবে কোনোভাবেই শুধু ভোগ করা যাবে না। ভোগ আর উদযাপন এক জিনিস নয়।

উদযাপন হলো এমন কিছু, যা নিজের কিংবা অন্যের মনে কষ্টের কারণ হবে না; বরং ভবিষ্যতে সুন্দর ও স্মৃতিময় হয়ে থাকবে।

পৃথিবীতে এখন প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ। প্রত্যেক মানুষের যেমন নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, তেমনি প্রত্যেকেরই দিন-রাত্রির মতো সমস্যা আছে। তুমি, তোমার বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব কিংবা অন্য কোনো প্রিয়জন—কেউই সমস্যার ঊর্ধ্বে নয়।

৪.

সমস্যাকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো সমস্যাকে মাথার মধ্যে এমনভাবে ধরে রাখা যাবে না, যাতে সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে ওঠে।

সমস্যা মাথায় ধরে রাখলে তা আরও ভারী হয়ে ওঠে, আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।

মাথায় সমস্যা থাকবে, কিন্তু সেই সমস্যাকে হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে মোকাবিলা করে জীবনকে এগিয়ে নিতে হবে।

দেখো, পৃথিবীর কত মানুষ কত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কত বড় হয়েছেন।

আব্রাহাম লিংকন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, স্টিফেন হকিং কিংবা নিক ভুজিসিক—প্রত্যেকের জীবনেই ছিল অসংখ্য প্রতিকূলতা। কিন্তু তারা সেই প্রতিকূলতার কাছে নিজেদের পরাজিত হতে দেননি।

আমি চাই, আমার সন্তানেরা অন্তত নিজেকে জয় করুক।

সমস্যাকে সমস্যা ভেবে মাথা ভারী করে রাখলে জীবনে কখনোই সামনে এগোনো যায় না।

৫.

পৃথিবীতে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বলে আসলে কিছু নেই। এটা অনেকটাই আমাদের তৈরি করা ধারণা।

জীবনে কোনো কিছুতেই প্রথম হওয়া জরুরি নয়। মানুষ হওয়াটাই জরুরি, বরং অত্যাবশ্যক।

সত্যিকারের মানুষ হতে পারলে অন্য অনেক কিছু অর্জন করা সহজ হয়ে যায়।

পৃথিবীতে ধর্ম এসেছে মানুষসহ সব সৃষ্টির কল্যাণের জন্য। কিন্তু কিছু উগ্র মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে। মারামারি, কাটাকাটি, এমনকি হত্যার পথেও যায়। এটি সত্যিকারের ধর্ম কিংবা ধার্মিক মানুষের স্বরূপ নয়।

সত্যিকারের ধার্মিকরা শান্ত, সহজ, সরল ও অতি সাধারণ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে অন্যের কাছে শান্তির বাণী পৌঁছে দেন। এভাবেই তারা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান এবং অন্যদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকেন।

৬.

জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নাও।

জীবন যত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে, ততই সেটি তোমার কাছে সরল হয়ে উঠবে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক। আমরা জীবনকে যেমন ভারী করি, তেমনই সহজও করতে পারি।

পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা জীবনকে সাধারণ, স্বাভাবিক ও সহজ-সরল রেখেও বিখ্যাত হয়েছেন। আবার অনেকে বর্ণিলভাবে জীবনকে উদযাপন করেছেন।

পৃথিবী সাধারণ, স্বাভাবিক, সহজ-সরল, সফল ও সার্থক মানুষকে চিরকাল মনে রাখে। বাকিরা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়।

আমি চাই, আমার সন্তান শুধু শিক্ষা, পদ, পদবি কিংবা বিত্তে বড় হয়ে উঠুক—এটা নয়।

আমি চাই, সে চিত্তে বড় হয়ে উঠুক।

সত্যিকারের মানুষ হয়ে নিজের জীবন এবং চারপাশকে আলোকিত করুক। জীবনকে উদযাপন করুক, বর্ণিল ও রঙিন করে তুলুক।

আমি কোনো উত্তর চাই না।

শুধু একজন জন্মদাতা বাবা থেকে পিতা হয়ে উঠতে চাই।

আর যেদিন আমি মারা যাব—

আমার লাশ দেখার তাড়াহুড়োয়
কপালে চুমু দিতে ভুলে যেও না।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে শেভরনকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পুত্রের কাছে পিতার আবেগময় অনন্য চিঠি

প্রকাশ : ০৪:৪১:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আহনাফ শারার
সিএসই, ৭ম সেমিস্টার
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যামব্রিজ, যুক্তরাজ্য

তোমার কাছে আমার কিছু জরুরি কথা

শোন বাবা আমার,

তোমাকে কিছু কথা বলা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছি। হয়তো সেগুলো আবারও ফিরে আসবে। তুমি বিষয়গুলো সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে—এই প্রত্যাশা রাখি।

১.

তোমার এখন যে বয়স, এই বয়সে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক কিছু অস্বীকার করে নতুন করে সাজানোর ইচ্ছা থাকা খুবই স্বাভাবিক। মতের ভিন্নতা সভ্যতারই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সমালোচনা মানেই বিদ্বেষ নয়; বরং চিন্তা ও চেতনার খোরাক।

মৃত্যু, দিবা-রাত্রি, সূর্যের উদয়-অস্ত—এমন গুটিকয়েক বিষয় ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সবকিছুই অবস্থান ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীতে চিরস্থায়ী সত্য বলে তেমন কিছু নেই। আজকের সত্য বা মিথ্যা সময়ের প্রবাহে গিয়ে বদলে যেতে পারে।

যারা নতুন করে সাজানোর চিন্তা করে, তারা একদিন অনেক বড় কিছু অর্জন করতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন ঘটাতে প্রয়োজন ধৈর্য, বিনয় এবং অন্যকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার ক্ষমতা। বর্তমানের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎকে সুসংগঠিত করতে হয়।

অন্যদিকে, যারা অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক, বর্তমানকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং অন্যকে অসম্মান করে, তারা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। একসময় হারিয়ে যায়। ইতিহাস তার অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে রেখেছে।

মনে রাখবে—শিক্ষিত মানেই জ্ঞানী নয়। জ্ঞানী হতে হলে প্রচলিত শিক্ষার বাইরে আরও অনেক কিছু জানতে হয়, সাধনা করতে হয় এবং সর্বোপরি মানুষ হয়ে উঠতে হয়। সেটা তোমার আচরণে, জীবনযাপনে এবং উদযাপনে প্রকাশ পাবে।

দৃশ্যত মানুষ অনেকেই; কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠা খুব কঠিন। জ্ঞান, বিবেক, মানবিকতা ও সংবেদনশীলতাই মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানুষ করে তোলে।

তোমার মধ্যে অনেক ইতিবাচক দিক আমি দেখেছি। বাবা হিসেবে তাই মাঝে মাঝে শঙ্কা হয়—এই ভালো দিকগুলো যদি কোনোদিন হারিয়ে যায়!

হেসো না। সত্যিকারের বাবা-মা বোধহয় এমনই চিন্তা করেন।

আর একটা কথা মনে রেখো—সমর্পণ মানে বিসর্জন কিংবা পরাজয় নয়। আপাতদৃষ্টিতে ছোট ছোট পরাজয় অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি জয়ের নিয়ামক হয়ে ওঠে।

তর্কে জিতে সাময়িক নীরবতা পাওয়া যায়, কিন্তু অপরজন শান্তি পায় না। তর্কে জিততে গিয়ে অনেকেই সত্যকে দুর্বল করেছে, সম্পর্ককে অস্থায়ী করেছে, এমনকি চিরদিনের জন্য প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। তোমার আশপাশে এমন অনেক জ্বলন্ত উদাহরণ আছে।

২.

নিজস্ব পরিবেশে একাকী বেড়ে ওঠার অনেক ভালো দিক আছে, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। যেমন—মানুষের সামনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করা, সহজে মিশতে না পারা, চিন্তার পরিসর সীমিত হয়ে যাওয়া, নিজের বিশ্বাসে অতিরিক্ত অটল থাকা এবং নতুন বা ভিন্ন কিছু সহজে গ্রহণ করতে না পারা।

আমার ছোটবেলাও অনেকটা এভাবেই কেটেছে।

মা ও মাতৃত্ব যেমন এক নয়, ঠিক তেমনি পিতা ও পিতৃত্বও এক নয়। একজন মানুষ পিতা হতে পারেন, কিন্তু পিতৃত্ব অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অনেক ত্যাগ, কষ্ট, মমতা ও সাধনার মধ্য দিয়ে পিতৃত্ব অর্জন করতে হয়।

পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হলো আপনত্ব। আর আপনত্ব তৈরি হয় প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, কখনো হয়তো বর্জনীয়—সব ধরনের আলাপচারিতায়; নিয়মিত যোগাযোগে, কথোপকথনে, ভালোবাসায় এবং স্পর্শে।

তোমার মা এবং আমি সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি বা ভবিষ্যতে কতটুকু পারব, সেটা আমরা বলতে পারি না। সময়ই তার উত্তর দেবে।

সন্তানেরা মা-বাবার সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে পারে, মা-বাবাকে নয়।

শিক্ষা কিংবা কর্মজীবন মা-বাবা ও সন্তানের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে, কিন্তু মনের মধ্যে নয়। অবস্থানগত কারণে তুমি কাছে থাকো কিংবা দূরে—যেখানেই থাকো, যদি মনের দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, তাহলে মূল সম্পর্কটিই একসময় হারিয়ে যায়।

টাকা দিয়ে নিরাপদ বাড়ি কেনা যায়, কিন্তু ঘর তৈরি করা যায় না।

স্নেহ, মায়া, মমতা, স্পর্শ, আদর ও ভালোবাসা ছাড়া ঘর হয় না। এখানে ঘর বলতে চার দেয়ালে ঘেরা কোনো কাঠামোকে বোঝাচ্ছি না; মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের বন্ধনের নামই ঘর।

৩.

আমার কাছে মনে হয়েছে, কিছু কিছু বিষয়ে তোমার চিন্তা ও চেতনা একই জায়গায় খুব অনড় ও অটল। এটা ভালো। নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থাকা জরুরি।

কিন্তু তার প্রকাশ সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় নমনীয় হয় না।

আমি আগেই বলেছি—যেহেতু পৃথিবীতে চিরস্থায়ী বলে তেমন কিছু নেই, তাই সবসময় নিজের অবস্থানে অনড় থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কখনো কখনো অপরকে সম্মান করে এক পা পিছিয়ে আসাও প্রজ্ঞার পরিচয়।

বোকা মানুষই সাধারণত ভাবে, নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়া যাবে না। আমার ছেলে নিশ্চয়ই বোকা নয়—এটাই আমার বিশ্বাস।

মানুষের জীবনে সমস্যা আসবে, বিপদ আসবে, একাকীত্ব আসবে; ভয়েরও উৎস তৈরি হবে। এগুলো জীবনেরই অংশ।

ভয়ের কাছে সাময়িকভাবে আত্মসমর্পণ করলে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা পাওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না। বরং পরবর্তী আরও বড় ভয়ের ভিত্তি তৈরি হয়।

তাই ভয়কে জয় করে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। এটাই জীবনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

যারা ভয়কে জয় করতে পারে না, তারা হতাশ হয়, হেরে যায়; সফল ও সার্থক হতে পারে না।

আর একটা কথা—পৃথিবীতে আলাদা করে ‘সুখ’ বলে হয়তো কিছু নেই। দুঃখের মধ্য দিয়েই মাঝেমধ্যে সুখানুভূতি আসে। তাই জীবনকে উদযাপন করতে হয়।

তবে কোনোভাবেই শুধু ভোগ করা যাবে না। ভোগ আর উদযাপন এক জিনিস নয়।

উদযাপন হলো এমন কিছু, যা নিজের কিংবা অন্যের মনে কষ্টের কারণ হবে না; বরং ভবিষ্যতে সুন্দর ও স্মৃতিময় হয়ে থাকবে।

পৃথিবীতে এখন প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ। প্রত্যেক মানুষের যেমন নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, তেমনি প্রত্যেকেরই দিন-রাত্রির মতো সমস্যা আছে। তুমি, তোমার বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব কিংবা অন্য কোনো প্রিয়জন—কেউই সমস্যার ঊর্ধ্বে নয়।

৪.

সমস্যাকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো সমস্যাকে মাথার মধ্যে এমনভাবে ধরে রাখা যাবে না, যাতে সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে ওঠে।

সমস্যা মাথায় ধরে রাখলে তা আরও ভারী হয়ে ওঠে, আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।

মাথায় সমস্যা থাকবে, কিন্তু সেই সমস্যাকে হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে মোকাবিলা করে জীবনকে এগিয়ে নিতে হবে।

দেখো, পৃথিবীর কত মানুষ কত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কত বড় হয়েছেন।

আব্রাহাম লিংকন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, স্টিফেন হকিং কিংবা নিক ভুজিসিক—প্রত্যেকের জীবনেই ছিল অসংখ্য প্রতিকূলতা। কিন্তু তারা সেই প্রতিকূলতার কাছে নিজেদের পরাজিত হতে দেননি।

আমি চাই, আমার সন্তানেরা অন্তত নিজেকে জয় করুক।

সমস্যাকে সমস্যা ভেবে মাথা ভারী করে রাখলে জীবনে কখনোই সামনে এগোনো যায় না।

৫.

পৃথিবীতে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বলে আসলে কিছু নেই। এটা অনেকটাই আমাদের তৈরি করা ধারণা।

জীবনে কোনো কিছুতেই প্রথম হওয়া জরুরি নয়। মানুষ হওয়াটাই জরুরি, বরং অত্যাবশ্যক।

সত্যিকারের মানুষ হতে পারলে অন্য অনেক কিছু অর্জন করা সহজ হয়ে যায়।

পৃথিবীতে ধর্ম এসেছে মানুষসহ সব সৃষ্টির কল্যাণের জন্য। কিন্তু কিছু উগ্র মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে। মারামারি, কাটাকাটি, এমনকি হত্যার পথেও যায়। এটি সত্যিকারের ধর্ম কিংবা ধার্মিক মানুষের স্বরূপ নয়।

সত্যিকারের ধার্মিকরা শান্ত, সহজ, সরল ও অতি সাধারণ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে অন্যের কাছে শান্তির বাণী পৌঁছে দেন। এভাবেই তারা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান এবং অন্যদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকেন।

৬.

জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নাও।

জীবন যত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে, ততই সেটি তোমার কাছে সরল হয়ে উঠবে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক। আমরা জীবনকে যেমন ভারী করি, তেমনই সহজও করতে পারি।

পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা জীবনকে সাধারণ, স্বাভাবিক ও সহজ-সরল রেখেও বিখ্যাত হয়েছেন। আবার অনেকে বর্ণিলভাবে জীবনকে উদযাপন করেছেন।

পৃথিবী সাধারণ, স্বাভাবিক, সহজ-সরল, সফল ও সার্থক মানুষকে চিরকাল মনে রাখে। বাকিরা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়।

আমি চাই, আমার সন্তান শুধু শিক্ষা, পদ, পদবি কিংবা বিত্তে বড় হয়ে উঠুক—এটা নয়।

আমি চাই, সে চিত্তে বড় হয়ে উঠুক।

সত্যিকারের মানুষ হয়ে নিজের জীবন এবং চারপাশকে আলোকিত করুক। জীবনকে উদযাপন করুক, বর্ণিল ও রঙিন করে তুলুক।

আমি কোনো উত্তর চাই না।

শুধু একজন জন্মদাতা বাবা থেকে পিতা হয়ে উঠতে চাই।

আর যেদিন আমি মারা যাব—

আমার লাশ দেখার তাড়াহুড়োয়
কপালে চুমু দিতে ভুলে যেও না।