প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে যেখানে শেষ হয়েছিল, সেই ভার্সাইয়ে এক নৈশভোজ শেষে ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তিতে সই করার কয়েক দিন আগে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের কৌশলের কথা জানিয়েছিলেন। তাঁদের কৌশলটি ছিল, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র তেলের ওপর থেকে এমনভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, যাতে ইরান শত শত কোটি ডলারের তেল বিক্রি করতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, কৌশলটি হলো, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার পর ইরান বিপুল রাজস্বপ্রবাহ ও পশ্চিমা ব্যাংকগুলোয় ডলারে লেনদেনের সুযোগ পেয়ে দ্রুত এই দিকে মনযোগী হয়ে উঠবে। গত ১৭ জুন সমঝোতা স্মারকে সই করার তিন দিন আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিককে ফোনে প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, এটি ‘ইরানের জন্য সত্যিই একটি দারুণ চুক্তি’।
ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা আসলে এই চুক্তি নিয়ে গর্বিত।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, ক্রমাগত মার খেতে খেতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।’ তবে বাস্তবে তা মনে হচ্ছে না।
চুক্তির এক মাস পার না হতেই ওই প্রণালি দিয়ে যাওয়া তিনটি জাহাজে হামলা হয়। হামলার স্থানটি ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এর জেরে ট্রাম্প তেল বিক্রির জন্য ইরানকে দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করে দেন। এরপর টানা দুই রাত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৭০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি বড়, জটিল ও স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছিল। অন্তত এখন পর্যন্ত সেই চুক্তির বিষয়ে কোনো আলোচনার সময়সূচি ঠিক করা হয়নি।
বোমা হামলা ও প্রাথমিক চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীদের হাতে যদি এখন কোনো ‘প্ল্যান সি’ থাকেও, তাঁরা সে বিষয়ে কিছুই তুলে ধরেননি; বরং মনে হচ্ছে, তাঁরা আগের মতো আবারও তেল নিষেধাজ্ঞা ও বোমা হামলার পথেই হাঁটছেন। ট্রাম্প এসব পদক্ষেপকে ‘বিধ্বংসী’ বলে বর্ণনা করলেও এর ফলে এখন পর্যন্ত কেবল জটিলতাই তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে।
‘সুতরাং বিষয়টি খুব সহজ’—গত বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন। তিনি বলেন, ‘তারা যদি জাহাজে গুলি চালায়, তবে আমরা তাদের নরক দেখিয়ে ছাড়ব।’ জেডি ভ্যান্স প্রথমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁকে এই যুদ্ধের পক্ষে কথা বলার এবং আলোচনা করে সংকট সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যভাবে বললে, মুলা ঝুলানোর দিন শেষ। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। কিন্তু (মার্কিন) প্রশাসন এখনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, কেন তারা মনে করছে যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বোমা হামলার এই কৌশল এবার ভিন্ন কোনো ফল বয়ে আনবে।
প্রবীণ কূটনীতিক রিচার্ড এন হাস বলেন, ‘আমরা কৌশলগতভাবে এমন এক জায়গায় এসে আটকে গেছি, যেখান থেকে সামনে এগোনোর পথ নেই।’ তিনি ইরাক যুদ্ধের শুরুর দিকে জর্জ ডব্লিউ বুশসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন প্রশাসনে পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে কাজ করেছেন।
এন হাস বলেন, ‘এখানে সংকট হলো, আমরা যত বেশি হামলা চালাব, ইরানও উপসাগরীয় এলাকার তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে তত বেশি পাল্টা হামলা চালাবে। আর (মার্কিন) প্রশাসন এখনো বের করতে পারেনি, কীভাবে ওই সব স্থাপনা রক্ষা করা যায়।’
রিচার্ড হাস আরও বলেন, ট্রাম্প প্রথমে ভেবেছিলেন, বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের সরকার পতন ঘটাবেন। এরপর তিনি ভাবলেন, বোমা মেরে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবেন—কোনোটিই কাজে আসেনি।
তেল বিক্রির মাধ্যমে ইরানকে লাভবান হওয়ার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও কোনো কাজে আসেনি বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটি সিদ্ধান্ত। কারণ, তাঁর প্রথম মেয়াদে এবং এক মাস আগেও মনে হচ্ছিল, তিনি আলোচনার চেয়ে শাস্তির পথেই বেশি আগ্রহী।
ইরানকে ট্রাম্পের তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার পেছনে একটি বিশ্বাস কাজ করেছিল। গত বছর গাজা নিয়ে আলোচনার সময়ও এই বিশ্বাস দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, বিপ্লবীরাও একটি আধুনিক ও সচল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখেন, যা তাঁদের দেশের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
ট্রাম্প ইরানের ভেতরের তীব্র (রাজনৈতিক) বিভাজনের ফাঁদেও আটকা পড়েছেন। চলতি সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার সময় সেই বিভাজন খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আগ্রাসনের প্রথম প্রহরেই খামেনি নিহত হন।
খামেনির একটি শোকযাত্রায় মধ্যস্থতাকারী দলের অন্যতম প্রধান সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির দিকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করেছেন। হামলাকারী ব্যক্তিরা তাঁকে অভিশাপ দেন এবং তাঁর মৃত্যু কামনা করে স্লোগান দেন।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে নেন তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা।
কিন্তু ট্রাম্প যখন জনসমক্ষে ইরান নিয়ে কথা বলেন, তখন তিনি দেশটির সমাজের এই বিভাজন নিয়ে খুব সামান্যই কথা বলেন; বরং তিনি এমনভাবে কথা বলেন, যেন ইরানের সরকার কেবল ওপর থেকে নিচে পরিচালিত হয় এবং এর নেতৃত্বে আছেন মোজতবা খামেনি। মোজতবা হলেন নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে এবং উদীয়মান নেতাদের একজন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প এই নেতাদের আগের নেতাদের চেয়ে বেশি ‘যুক্তিমনস্ক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের কুহেস্তাক বন্দরের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে, ৮ জুলাই ২০২৬। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও চিত্র থেকে নেওয়া স্থিরচিত্রপারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের কুহেস্তাক বন্দরের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে, ৮ জুলাই ২০২৬। অথচ গত বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প নতুন নেতৃত্বকে ‘বাজে লোক’ বলেছেন।
গত বৃহস্পতিবার সম্মেলন থেকে ফিরে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব সামান্যই কথা বলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসন এখনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা আশা করছেন, ‘কারিগরি স্তরের আলোচনা’ চালিয়ে যাওয়া হবে।
কিন্তু এই কথার মধ্যেও স্ববিরোধিতা রয়েছে। কারণ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে মতবিরোধ রয়েছে, তা কোনো ‘কারিগরি’ সমস্যা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক। আর নিচের দিকের কর্মকর্তাদের এই সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দেওয়া হবে না। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ।
গত জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান তার মজুত পারমাণবিক জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখবে কি না, সে বিষয়টিও। ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সই করা একটি চুক্তির অধীনে ইরান তাদের তখনকার মজুত পারমাণবিক জ্বালানির ৯৭ শতাংশ হস্তান্তর করেছিল। তবে ট্রাম্প পরে ওই চুক্তি থেকে সরে আসেন। ওবামার চেয়ে তিনি কম সুবিধা আদায় করতে পারেন, এমন যেকোনো কথায় ট্রাম্প অত্যন্ত স্পর্শকাতর আচরণ করেন (রেগে যান)।
তবে প্রথম রাজনৈতিক লড়াইটি শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্ন নিয়ে। ভার্সাইয়ে ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকে সই করেছিলেন, সেখানে একটি অস্পষ্ট অনুচ্ছেদের কারণে প্রশাসনকে এখন মূল্য চোকাতে হচ্ছে। কোনো চুক্তির দলিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা যখন মতবিরোধগুলো এড়িয়ে যান এবং পরে যাঁর যাঁর সুবিধামতো সেটার ভিন্ন অর্থ বের করেন, তখন কী হয়, এটি তার একটি বড় উদাহরণ।
চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—‘এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর থেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিক থেকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এই চলাচলের জন্য কেবল ৬০ দিন কোনো মাশুল নেওয়া হবে না।’
ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা ভেবেছিলেন, এই শর্তের মাধ্যমেই জাহাজ চলাচলের জট খুলবে এবং এর সব দায়িত্ব ইরানের ওপরই বর্তাবে। অন্যদিকে ইরান এটিকে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের প্রধান পথটি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। তারা জোর দিতে থাকে, জাহাজগুলোকে তাদের উপকূলের কাছের চ্যানেল দিয়েই যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল আরোপের পরিকল্পনা করছে।
মার্কিন নৌবাহিনী যখন ওমানের কাছাকাছি একটি ভিন্ন চ্যানেল দিয়ে প্রকাশ্যে জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে, তখন ইরান কিছু জাহাজে গুলি চালিয়ে তার জবাব দেয়। শিপিং–বিষয়ক প্রতিষ্ঠান লয়েডস অব লন্ডনের মতে, এখন ওই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল খুবই কম বললেই চলে। এই বিষয়টিই ট্রাম্পকে হতাশ করেছে এবং এর জেরেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ হয়ে গেছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিযুক্ত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে চলছে যানবাহন। তেহরান, ২০ এপ্রিল ২০২৬ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিযুক্ত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে চলছে যানবাহন। তেহরান, ২০ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত
তবে ট্রাম্পের সহযোগীদের দাবি, তাঁরা চুক্তির কোনো লঙ্ঘন করেননি। তাঁদের মতে, এই সমঝোতা স্মারকটি কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং ইরান সেই পরীক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
এসব ঘটনা ট্রাম্পকে আবার এপ্রিলে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সামরিক শক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইরানের অনেকেই যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার আগপর্যন্ত কেবল একটি ‘স্থিতাবস্থা’ হিসেবেই দেখে।
প্রথম ভোর ডেস্ক,ঢাকা 






















