সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যার নামের একটি পোশাক কারখানায় ‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্কের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২২ আগস্ট দুপুরের পর তৃতীয় তলার একজন নারী শ্রমিক ‘ভূত’ বলে চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন।
মুহূর্তের মধ্যেই এই আতঙ্ক পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার প্রায় অর্ধশত শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কর্তৃপক্ষ টানা দুদিন কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
তবে দেশের তৈরি পোশাক খাতে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূত বা জিনের আতঙ্কে শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার অন্তত ১১টি ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে যেসব বড় কারখানায় বিদেশি ক্রেতাদের নিয়মিত তদারকি থাকে, সেখানেই এমন ঘটনা বেশি দেখা গেছে।
সাধারণত কারখানার বাথরুম থেকে এসব গুজবের সূত্রপাত হয়। একজন শ্রমিক হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে ‘জিনে ধরেছে’ বলে গুজব রটে যায় এবং তা শুনে একে একে অন্য শ্রমিকরাও বমি ভাব, পেটব্যথা বা মাথা ঘোরানোর মতো উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হতে শুরু করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এসব ঘটনার পেছনে ভূত বা জিনের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ‘কনভারশন ডিজঅর্ডার’ বা ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ (গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ) বলা হয়। মূলত মানসিক চাপ, পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে এমন শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয় এবং তা একজন থেকে দ্রুত অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিক নেতারা এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের পেছনে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতাকে দায়ী করছেন। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি নাজমা আক্তার ও শ্রমিক নেতা বাবুল আখতারের মতে, নারী শ্রমিকরা অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক চাপে ভোগেন। কম মজুরির কারণে তাঁরা নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না এবং অনেক সময় অসুস্থ অবস্থাতেই কাজ করেন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, পুষ্টিহীনতা এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে কেউ বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে, সেখানে কুসংস্কার ও গুজবের ডালপালা মেলে।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা মনে করেন, এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকতে পারে। কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করে আর্থিক ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র এমন গুজব ছড়াতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ।
তবে নেপথ্যের কারণ যা-ই হোক না কেন, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কারখানায় মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো, যথাযথ কাউন্সেলিং এবং শ্রমিকদের বিশ্রাম ও পুষ্টির বিষয়ে আরও বেশি নজর দেওয়া জরুরি। সূত্র: প্রথম আলো
প্রথম ভোর ডেস্ক,ঢাকা 


















